ঐতিহাসিক এক দফার ঘোষণা
এখনও কিন্তু আমরা আগস্ট মাসে যাইনি, আমরা এখনও জুলাই মাসে আছি। এই জুলাই হত্যাকাণ্ডের ফয়সালা করেই আমরা আগস্টে যাবো। প্রিয় দেশবাসী এবং ছাত্র-জনতা সকলেই জানেন, যে কোটা সংস্কারের দাবিতে এবং মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের অভিপ্রায়ে আমরা বাংলাদেশের ছাত্র তরুণরা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সারা বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম। আমাদের ন্যায্য এবং যৌক্তিক আন্দোলনে আপনারা দেখেছেন কিভাবে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের বোনদেরকে ছাত্রলীগের হায়নারা পিটিয়েছে নির্মমভাবে হামলা করেছে।\n\nআমরা তারপরে দেখেছি, যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও দমনপীড়নে কাজে লাগিয়ে সারা দেশে ছাত্রদের উপরে নির্মম অত্যাচার শুরু করা হয়েছিলো। এর প্রতিবাদে আমরা সারা বাংলাদেশে শাট ডাউন কর্মসূচি দিয়েছিলাম এবং সেই শাট ডাউন কর্মসূচিতে সারা বাংলার অভিবাবক শিক্ষকসহ শ্রমিক ও সর্বস্তরের নাগরিকরা আমাদের ছাত্রদের সাথে আমাদের নিরাপত্তা দিতে নেমে এসেছিলেন। এবং আমরা দেখেছি, যেই সরকার সেই শাট ডাউন কর্মসূচিতে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে একটা ডিজিটাল ক্র্যাকডাউন শুরু করেছিলো। পরবর্তীতে পুলিশ পিছু হটলে, সেনাবাহিনীকে নামিয়ে কারফিউ জারি করা হয়েছিলো। তারপরও ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ থামে নাই।\n\n১৯ জুলাই কারফিউ ভাঙ্গার ঘোষণা আমরা দিয়েছিলাম রাতে এবং সেই ঘোষণা কোনো মিডিয়ায় প্রচার করতে দেয়া হয় নাই। ১৯ জুলাই আমাদের সমন্বয়ক কয়েকজনকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে অত্যাচার করে এবং আমাদেরকে জবরদস্তি করে আন্দোলন প্রত্যাহার এবং সরকারের সাথে সংলাপের জন্য। পরবর্তীতে দেখেছেন, হাসপাতালে আমাদেরকে জিম্মি করে রাখা হয়েছিলো এবং সেটাও না পেরে ডিবি অফিসে আমাদেরকে তুলে নিয়ে যেয়ে জিম্মি করে আমাদের থেকে বক্তব্য নিয়ে এসেছিলো।\n\nআপনাদের প্রতি সাধুবাদ থাকবে, সেই বক্তব্য বিশ্বাস না করে রাজপথ আপনারা দখলে রেখেছেন। এবং ডিবি অফিস থেকে আমাদেরকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা তারা করছিলো। আপনাদের আন্দোলন এবং আমাদের অনুসরণের কারণে তাদের সে পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে গিয়েছিলো। আমরা এখন স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এইযে এতগুলো খুন হয়েছে যেই লাশের হিসাবটা পর্যন্ত এখনও আমরা পাইনি। এই সরকার মানুষ খুন করেছে, মানুষ গুম করেছে এবং সে লাশও গুম করেছে। যারা খুন করেছে তারা কি খুনের বিচার করবে! তাদের কাছ থেকে আমরা আর খুনের বিচার প্রত্যাশা করি না এবং আজকে সর্বস্তরের নাগরিকদের উপরে ছাত্রদের উপরে এইযে ব্লকরেইড দিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে, গুম করা হচ্ছে নির্যাতন করা হচ্ছে, আমাদের ছাত্রনেতা, সমন্বয়ক এবং সাধারণ শিক্ষার্থী তাদের মোবাইল চেক করে তাদের বাসা থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।\n\nএকদিকে গ্রেফতার নিপীড়ন নির্যাতন, অপরদিকে আমাদেরকে সংলাপের জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে। আজকেও কুমিল্লাতে হামলা করা হয়েছে এবং নিহত করা হয়েছে আমার ভাই শহীদ হয়েছে। আমরা শহীদ হইতে ভয় পাই না। প্রিয় বন্ধুগণ, আজকে আমরা জানি জনগণের দাবি কি! আমাদের আর বলার প্রয়োজন নাই, সবাই জানে যে আমাদের এখন দফা একটি। এক দফা, এক দাবি।\n\nপ্রিয় বন্ধুগণ, আজকে আমাদের জন্য এই বাংলাদেশের জনগণ নেমে এসেছিলো। আমরা এই জনগণকে মুক্ত করতে এখন আমরা রাস্তায় নেমে এসেছি। আমরা আজকে এক দফার দাবিতে এখানে হাজির হয়েছি এবং আমরা বাংলাদেশের জীবনের নিরাপত্তা, সমাজের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা এক দফার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। এবং এই সরকার কোনোভাবে আর এক মিনিটও ক্ষমতায় থাকার বৈধতা রাখে না। শেখ হাসিনা বলেছে, গণভবনের দরজা খোলা আছে। আমরা সাধুবাদ জানাই, যে তিনি আগেই বুঝতে পেরেছেন যে গণভবনের দরজা খোলা রাখতে হবে, কারণ তার যাওয়ার সময় হয়েছে। আপনি দরজা খুলে অপেক্ষা করুন, আমরা সংলাপ নয় আমরা আপনাকে উৎখাত করার জন্য আসছি।\n\nবন্ধুগণ, খুব স্পষ্ট কথা শুধু শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করলেই হবে না। এইযে খুন, লুটপাট, দুর্নীতি এইদেশে হয়েছে তার বিচার হতে হবে। আমরা পদত্যাগ দিয়ে তাকে কোনো এক্সিট রুট দিতে চাই না। তাকে পদত্যাগও করতে হবে, বিচারের আওতায়ও আনতে হবে এবং শুধু শেখ হাসিনা নয় পুরো মন্ত্রীপরিষদ, সরকার সবাইকে পদত্যাগ করতে হবে। এবং এইযে রেজিম, এইযে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা এটাকে বিলোপ করতে হবে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গঠন করতে চাই, এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে চাই, যেখানে আর কখনই কোনো ধরণের স্বৈরতন্ত্র কোনো ধরণের ফ্যাসিজম আসবে না।\n\nসেই এক দফার উদ্দেশ্যে, আমাদের এখন দফাটি হলো, শেখ হাসিনাসহ এই সরকারের পতন এবং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ। এই সরকারের লুটপাট, গণহত্যাসহ দুর্নীতিসহ সকল কিছুর বিচার নিশ্চিত করা। আগের সকল হত্যা, খুন, গুম, নিপীড়নেরও বিচার করা হবে। সকল রাজবন্দীদের মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা প্রয়োজনে জেলমুক্ত করে আমাদের ভাইদেরকে নিয়ে আসবো। বন্ধুগণ, আমরা জেলের দরজা ভেঙে আমাদের বন্ধুদের, ভাইদের মুক্ত করে নিয়ে আসবো।\n\nজনগণকে আহ্বান করছি আপনারা, যে স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র-নাগরীক অভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেছে তার সাথে এসে যোগ দিন। পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় সংগঠিত হোন। আমরা খুব দ্রুতই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে ছাত্র-নাগরীক অভ্যুত্থানের জন্য সর্বস্তরের নাগরিক, ছাত্র সংগঠন এবং সকল পেশাজীবী মানুষের সাথে মিলে সম্মিলিত মোর্চা ঘোষণা করবো। সকলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যত বাংলাদেশ, বাংলাদেশের জাতীয় রূপরেখা আমরা খুব শীঘ্রই আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। তার আগ পর্যন্ত, আমরা জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে নামার আহ্বান জানাচ্ছি।\n\nআগামীকাল থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন চলবে। এই খুনি সরকারকে আমরা কোনোভাবেই সমর্থন দিবো না, কোনোভাবেই কো-অপরেট করবো না। যদি কোনোভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়, যদি কোনোভাবে কারফিউ দেয়া হয়, জরুরি অবস্থা দেয়া হয়, আমরা আজকে থেকেই বলে দিলাম আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি। আমরা প্রয়োজনে, গণভবন ঘেরাও করে আপনাকে উৎখাতের ব্যবস্থা করবো। বন্ধুগণ, ইতিহাস বলছে ছাত্র-নাগরীককে এখন দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের দাবি জানানোর কেউ নাই, আমাদেরকেই আমাদের দাবি বাস্তবায়ন করতে হবে।\n\nসবার প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা শান্তিপূর্ণভাবে অসহযোগ এবং রাজপথের কর্মসূচি পালন করবেন, জনগণকে আসতে উদ্বুদ্ধ করবেন। নিরাপত্তা বাহিনী, সেনাবাহিনী, সরকারী কর্মকর্তা, সবার কাছে আহ্বান থাকবে, জনগণ যদি সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে, সরকার যদি জনগণের বিপক্ষে দাঁড়ায় সেই সরকারের হুকুম মানতে আপনারা বাধ্য নন। খুনি সরকারকে সমর্থন না দিয়ে, ছাত্র-নাগরীকের পাশে দাঁড়ান। আমরা আপনাদেরকে আমাদের মিছিলে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।\n\nআমি সংক্ষেপে আমার বক্তব্য শেষ করছি। আমরা এক দফা, এই সরকার এবং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ঘোষণা করছি। এর জন্য ছাত্র-নাগরীকের অভ্যুত্থান আহ্বান করছি। আগামীকাল থেকে অসহযোগ কর্মসূচি পালিত হবে। আপনাদের প্রতি আহ্বান থাকবে, যদি আমাদেরকে খুন, গ্রেফতার করা হয়, মেরে ফেলাও হয়, আমাদের জীবনের বিনিময়ে শেষ রক্ত পর্যন্ত এই লড়াই সবাই চালিয়ে যেতে হবে। এখানে কোনো নেতৃত্ব নাই, সমন্বয়ক নাই, বাংলাদেশের জনগণই জনযুদ্ধের নেতৃত্ব দিবে। আমরা কিন্তু একাত্তরের অসহযোগ ঘোষণা করেছি, কোনো গান্ধিবাদী অসহযোগ ঘোষণা করি নাই। আমরা শান্তিপূর্ণ থাকবো, যদি আপনারা অস্ত্র না চালান, আপনারা গুলি না চালান। কিন্তু যদি শিক্ষার্থীদের উপর গুলি চলে, নাগরিকদের উপর অস্ত্র চলে তাহলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।